সংবাদ শিরোনাম: |
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশের রাজনীতি ততই অজানা সমীকরণে এগোচ্ছে। আওয়ামীলীগের মাঠে অনুপস্থিতি, বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং জনমানসে হতাশার আবহ রাজনীতির গতিপথকে অনেকটাই অচেনা করে তুলেছে। এই অচেনা আবহেই দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন বরগুনা-২ (বামনা, পাথরঘাটা ও বেতাগী) নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা—ইসলামপন্থীরা কি এখানে গেমচেঞ্জার হয়ে উঠতে পারে?
বরগুনা-২ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পালাবদলে আবর্তিত। কিন্তু বর্তমানে মাঠের বাস্তবতা বলছে- এই দ্বৈরথে ফাটল ধরেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এই শূন্যতায় ধর্মভিত্তিক দলগুলো- বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ইসলামপন্থীদের উত্থান বরগুনা-২ তে নতুন নয়। ১৯৯৬ সালে ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী গোলাম সরোয়ার হিরু জয়ী হয়েছিলেন মিনার প্রতীকে। ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সৈয়দ এছহাক মোঃ আবুল খায়ের প্রায় ১৬ হাজার ভোট পেয়েছিলেন (যা প্রাপ্ত ভোটের ৯.৩ শতাংশ)। এরপর ২০১৩ সালের উপনির্বাচনে গোলাম সরোয়ার হিরু আবারো প্রার্থী হয়ে প্রায় ৬০ হাজার ভোট অর্জন করেন। এই ভোটের হার কোনোভাবেই উপেক্ষণীয় নয়। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে- এই ভোটগুলো এসেছে নির্দিষ্ট একটি ধারার জনসমর্থন থেকে, যা মসজিদ-মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সমাজ কাঠামো, ধর্মীয় আবেগ এবং কওমি শিক্ষার ওপর ভর করে গড়ে উঠেছে।
এই ভোটব্যাংক যদি বিভক্ত থাকে, তবে তা হয়তো নির্বাচনের সমীকরণে তেমন বড় প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু যদি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জামায়াতে ইসলামী, জমিয়ত, খেলাফত মজলিসসহ অন্যান্য ইসলামপন্থী দলগুলো একক প্রার্থী দিতে সক্ষম হয়, তবে রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলে যেতে পারে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই ডা. সুলতান আহমেদকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক এবং এলাকায় পরিচিত মুখ। ইসলামী আন্দোলন এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি, তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তিনজনের নাম আলোচনায় রয়েছে: আলহাজ্ব মোহাম্মদ নাসিম খান (ব্যবসায়ী, ইসলামী শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সদস্য)। মুফতি আব্দুর রহমান বেতাগী (জেলা উপদেষ্টা)। মাওলানা মনিরুল ইসলাম তালুকদার (পাথরঘাটা শাখার উপদেষ্টা)। এই প্রার্থীদের কেউ মনোনীত হলে ‘হাতপাখা’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বামনা উপজেলা সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুস সোবহান খান বলেন, ইসলামী রাজনীতির শক্তিকে আমরা আর নিছক বিকল্প হিসেবে দেখতে চাই না। এই দেশের জনগণ ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাস করে, সেই বিশ্বাসকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করাও জরুরি। আমাদের সংগঠন মাঠে সক্রিয়, আমরা জনগণের সংস্পর্শে আছি। আমরা এমন একজন প্রার্থী চাই, যিনি ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য হবেন, আবার সামাজিকভাবে মানুষের পাশে থাকবেন। একক প্রার্থী দেওয়ার উদ্যোগ যদি আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, তাহলে বরগুনা-২ শুধু একটি আসন নয়, একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে ইনশাআল্লাহ।
বামনা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক মোঃ সাইফুল্লাহ মানসুর বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা সংগঠনের সর্বস্তরে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। কেন্দ্র থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত আমাদের সাংগঠনিক কাঠামো সক্রিয়। বরগুনা-২ আসনে আমরা একজন পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী ও জনসমর্থিত প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই এলাকার মানুষ পরিবর্তন চায়। নির্বাচনী মাঠে আদর্শ, মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় সংবেদনশীলতা বড় ভূমিকা রাখে। যদি ইসলামপন্থী সব দল একটি গ্রহণযোগ্য একক প্রার্থীকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তাহলে আমরা কেবল একটি বিকল্প নই- বরং এ অঞ্চলের জনগণের আশার প্রতীক হয়ে উঠতে পারব ইনশাআল্লাহ।
বিগত বামনা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এর গাজীপুর মহানগরের সাবেক সভাপতি ও সাবেক কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক আব্দুল জলিল আকন্দ বলেন: দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রতিফলন বরগুনা-২ আসনেও দৃশ্যমান। এখানে ইসলামী দলগুলোর সামনে একটি বাস্তব ও কৌশলগত সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি বড় দল হলেও স্থানীয় পর্যায়ে দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট।
জুলাইয়ের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জনমনে একটি পরিষ্কার বার্তা তৈরি হয়েছে। সাধারণ ভোটাররা আর ফ্যাসিবাদ, চাঁদাবাজি বা টেন্ডারবাজির রাজনীতি দেখতে চায় না। তারা বিকল্প নেতৃত্ব, নৈতিকতা এবং মূল্যবোধনির্ভর রাজনীতিকে সমর্থন করতে প্রস্তুত।
এই পরিপ্রেক্ষিতে জনগণ ইসলামপন্থী দলগুলোর সম্মিলিত প্রার্থী প্রত্যাশা করছে। অতীতের বিভক্তি, তিক্ততা ও সংকীর্ণতা পেছনে ফেলে যদি জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট সব দল আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য একক প্রার্থী ঠিক করতে পারে, তাহলে জনগণ বিএনপির বিকল্প হিসেবে ইসলামপন্থীদের দিকেই ঝুকবে।
আমাদের বিশ্বাস- যদি একটি লেভেল প্লেয?িং ফিল্ড তৈরি হয়, নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, এবং ইসলামপন্থীরা ঐক্যবদ্ধ প্রচারে নামতে পারে, তাহলে আমরা এ আসনে আমাদের প্রার্থীকে বিপুল ভোটে জয়ী করতে পারব ইনশাআল্লাহ।
এই সমীকরণের অন্য প্রান্তে রয়েছে বিএনপি। দলের প্রবীণ নেতা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনের মৃত্যুর পর স্থানীয়ভাবে নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক এমপি আলহাজ্ব নূরুল ইসলাম মনি, বিএনপি নেতা জাকির খান এবং আমেরিকা প্রবাসী মাওলানা শামীম হোসাইন। তবে স্থানীয় নেতারা মনে করছেন, তৃণমূল সংযোগ ও অভিজ্ঞতার কারণে মনি সবচেয়ে এগিয়ে আছেন।
তবে স্থানীয় বিএনপির ভেতরেও গ্রুপিং ও কোন্দল প্রবল। একদিকে খন্দকার মাহবুব হোসেনের অনুসারী পুরনো নেতৃত্ব, অন্যদিকে কিছু নতুনমুখ এবং ত্যাগী কর্মীদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বারবার দ্বিধা ও দোটানায় পড়ার ফলে মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ইসলামী ভোটব্যাংকের একটি সুসংগঠিত বিকল্প বিএনপির জন্য চাপ হয়ে উঠতে পারে।
বরগুনা-২ আসনটি একটি ভাসমান ভোটের এলাকা। এখানে দল নয়, প্রার্থীর জনসম্পৃক্ততা, ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা বড় ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে। একজন প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, সমাজে তার সম্পর্ক এবং তরুণদের সঙ্গে তার যোগাযোগ- এই তিনটি বিষয়ই এখানে নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
এখন পর্যন্ত মাঠের তথ্য বলছে- ইসলামপন্থীদের ভোটব্যাংক দৃশ্যমান, সংগঠন সক্রিয়, এবং স্থানীয় নেতৃত্ব প্রস্তুত। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি আর বিএনপির নেতৃত্ব সংকট- এই দুই বাস্তবতায় ইসলামপন্থীরা একটি ঐতিহাসিক সুযোগের মুখে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু শর্ত একটাই: ঐক্য। যদি ইসলামপন্থীরা বিভক্ত থাকে, তবে তাদের শক্তি নিজেই দুর্বল হয়ে যাবে। কিন্তু যদি তারা একটি গ্রহণযোগ্য একক প্রার্থী দিতে পারে, ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে আধুনিক সাংগঠনিক কৌশল মিশিয়ে মাঠে নামে, তবে তারা বরগুনা-২ এ শুধু গেমচেঞ্জার নয়- জয়ী শক্তি হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে।
লেখক: মাহমুদুল হাসান আশিক(সাংবাদিক ও দক্ষিণাঞ্চলভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক)